বাংলাদেশের সংবিধান রচনা কমিটির চেয়ারম্যান ড. কামাল হোসেনকে স্বাধীনতা পদক না দেওয়া নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন প্রবীণ অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তিনি উল্লেখ করেন যে, সংবিধানের হস্তলেখক এ কে এম আবদুর রউফকে ২০১৬ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হলেও ড. কামাল হোসেন এই সম্মাননা পাননি। রেহমান সোবহান বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশের ইতিহাসটা এভাবে চলে।’ শনিবার বিকেলে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ড. কামাল হোসেনকে সংবর্ধনা ও গণফোরামের ৩৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। ড. কামাল হোসেন গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বর্তমানে দলটির ইমেরিটাস সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন।
রেহমান সোবহান ছাত্রজীবন থেকে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের কথা জানান। তিনি বলেন, কামাল হোসেনের রাজনৈতিক সফর ১৯৫২ সালে শুরু হয়েছিল এবং তিনি পুরো জীবন গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের একজন নামকরা আইনজীবী হিসেবে বৈশ্বিক পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেন। রেহমান সোবহান স্মৃতিচারণ করে বলেন, ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) থেকে অনেকে এসে ড. কামাল হোসেনকে আইসিজের বিচারক হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন, কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর নাম প্রস্তাব করা সম্ভব হয়নি।
ড. কামাল হোসেনের অবদান ও নীতিভিত্তিক রাজনীতি
প্রবীণ অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান আরও বলেন, অনেকেই মনে করেন ড. কামাল হোসেনকে স্বাধীনতা পদক দেওয়া উচিত ছিল। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, গত সরকার সংবিধানের হস্তলেখককে স্বাধীনতা পদক দিয়েছে, কিন্তু রচয়িতা পাননি। তিনি উল্লেখ করেন, ড. কামাল হোসেন পুরো জীবন নীতিভিত্তিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী হিসেবে সংবিধান প্রণয়নে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে দেশকে তুলে ধরতে এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানিমন্ত্রী হিসেবে দেশের গ্যাস সম্পদ রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন। রেহমান সোবহান বলেন, অঙ্গীকার ও সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি সুযোগ পাননি এবং নীতিভিত্তিক রাজনীতি তাঁর শেষ স্বপ্নের মধ্যে থাকবে।
অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বক্তব্য
অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতা আবদুল মঈন খান ড. কামাল হোসেনের সংবিধান প্রণয়নে যোগ্যতার প্রশংসা করেন। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘কামাল হোসেন বিভাজনের দেশে জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি করেছেন।’ তিনি নতুন গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার কমিশন আইনের সমালোচনা করে সংস্কার কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। সিপিডি’র সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য উল্লেখ করেন, কামাল হোসেনকে জাতির পক্ষ থেকেই সংবর্ধনা দেওয়া উচিত ছিল। তিনি সংবিধান রচনা, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও জাতীয় সম্পদ রক্ষায় আন্দোলন করেছেন। গণফোরামের সাবেক নির্বাহী সভাপতি অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ড. কামাল হোসেনকে ‘রাষ্ট্রের বাতিঘর’ আখ্যা দিয়ে তাঁকে সম্মানিত করার আহ্বান জানান এবং দেশে ধর্মান্ধতা ও উগ্রবাদের উত্থান রুখতে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, বাংলাদেশে বিরোধী দলে থেকে রাজনীতি করা ঝুঁকিপূর্ণ এবং ড. কামাল হোসেন ৩৩ বছর ধরে বিরোধী শিবিরে রাজনীতি করেছেন। বাসদ উপদেষ্টা খালেকুজ্জামান এবং সিপিবি সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন ড. কামাল হোসেনের দীর্ঘজীবন কামনা করেন এবং জাতীয় অভিভাবক হিসেবে তাঁর দিকনির্দেশনা প্রত্যাশা করেন।
ড. কামাল হোসেনের লিখিত বক্তব্য
অনুষ্ঠানে ড. কামাল হোসেন উপস্থিত না থাকলেও তাঁর পক্ষে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান একটি লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান। এতে বলা হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে একটি অশুভ শক্তি ও উগ্রপন্থীরা বিগত আমলের মতোই সন্ত্রাস, সংঘর্ষ, খুনোখুনি ও মব সংস্কৃতির এক নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। মুক্তিযুদ্ধের মীমাংসিত বিষয়গুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে সরকার এই শক্তিকে দমনে ব্যর্থ হলে দেশে ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হবে এবং এখনই সবার সতর্কতা প্রয়োজন। গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।