তোফায়েল আহমেদের প্রয়াণ: অবসান ঘটলো এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক অধ্যায়ের
বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রবাদপ্রতিম সারথী এবং বর্ষীয়ান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তোফায়েল আহমেদ চিরপ্রস্থানের পথে পাড়ি জমিয়েছেন। জীবনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমা শেষে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে দেশের সমগ্র রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং অবসান ঘটেছে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের। ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির মূলমঞ্চে তিনি যেভাবে স্বকীয়তার স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
ছাত্ররাজনীতির সোনালী দিন ও ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদান
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয়েছিল ষাটের দশকের উত্তাল দিনগুলোতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হল এবং পরবর্তীতে ডাকসুর ভিপি হিসেবে তিনি ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক নেতৃত্ব দেন। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তৎকালীন আইয়ুববিরোধী গণআন্দোলনে তার সাহসিক কণ্ঠস্বর কাঁপিয়ে দিয়েছিল শাসকের ভিত। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উপস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন তরুণ ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ।
তিনি ১৯৬৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পল্টনে শপথ দিবসের জনসভায় দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক স্লোগান তুলেছিলেন—“শপথ নিলাম শপথ নিলাম, মাগো তোমায় মুক্ত করবো, শপথ নিলাম শপথ নিলাম, মুজিব তোমায় মুক্ত করবো।” পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশকে শত্রুমুক্ত করে সেই স্লোগান বাস্তবায়ন করেছিলেন বলে তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে স্মরণ করতেন। ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে এসে পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং দীর্ঘ সময় দলটির গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জাতীয় রাজনীতি, সংসদীয় জীবন ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব
স্বাধীনতার পর তোফায়েল আহমেদ হয়ে ওঠেন জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তিনি সর্বমোট নয় বার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ভোলা থেকে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ‘মুজিব বাহিনী’র অঞ্চলভিত্তিক চার প্রধানের একজন হিসেবে তিনি পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন।
সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহুবার রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে ২০১৪-২০১৯ মেয়াতেও সফলতা ও দক্ষতার সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘদিন তিনি দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং পরবর্তীকালে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন।
ঝড়-ঝঞ্ঝাময় পথ ও শেষ বিদায়
তার রাজনৈতিক জীবন যেমন ছিল সাফল্যের, তেমনই ছিল নানা চড়াই-উৎরাইয়ে ভরা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম ট্র্যাজেডির পর সামরিক জান্তা তাকে গ্রেফতার করে ময়মনসিংহ ও কুষ্টিয়া কারাগারের কনডেম সেলে দীর্ঘ ৩৩ মাস বন্দি রাখে। সেখানে অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েও তিনি আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় প্রথম জানাজা শেষে তার মরদেহ জন্মভিটা ভোলায় নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে জেলা স্কুল মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হবে। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এই প্রবাদপ্রতিম রাজনীতিবিদের প্রয়াণে জাতি হারালো এক শ্রেষ্ঠ সন্তানকে।
#রাজনীতি #বাংলাদেশ #ইতিহাস #সংবাদ