তোফায়েল আহমেদের প্রয়ান: অবসান হলো এক উজ্জ্বল রাজনৈতিক অধ্যায়ের
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বর্ণাঢ্য ও প্রবীণ ব্যক্তিত্ব, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং আওয়ামী লীগ-এর বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ আর নেই। দীর্ঘ দিন নানা বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ভোগার পর ঢাকা-র স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের প্রধান নায়ক এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের রূপকার তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল, সাংবাদিক ও বিশিষ্ট মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার প্রয়ানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হলো।
ষাট ও সত্তরের দশকের সংগ্রাম এবং বর্ণাঢ্য ইতিহাস
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয়েছিল ষাটের দশকে। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা জেলায় জন্মগ্রহণ করা এই মহান নেতা ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হন। বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে স্নাতক পাসের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হলের ভিপি এবং পরবর্তীতে ডাকসুর ভিপি হিসেবে তিনি ঐতিহাসিক ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তৎকালীন আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে তার সাহসিক ভূমিকা শাসকের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার উপস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন তরুণ ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি থাকাকালে তিনি বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা আন্দোলনকে ১১ দফায় রূপান্তর করে গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর অন্যতম অধিনায়ক হিসেবে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পুরো রাজনৈতিক জীবনে মোট নয় বার জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের প্রতিক্রিয়া ও শেষ বিদায়ের আয়োজন
বর্ষীয়ান এই রাজনীতিকের মৃত্যুতে স্মৃতিচারণ করে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন দেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিকরা। নঈম নিজাম তার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, “বাংলাদেশের রাজনীতির একটা কিংবদন্তি অধ্যায়ের অবসান ঘটলো। তারুণ্যের দীপ্তি, সাহস আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে তিনি নিজের নাম অমর করে রেখে গেছেন।” লেখক আনিসুল হক তার স্মৃতিশক্তি ও অমায়িক ব্যক্তিত্বের কথা স্মরণ করে বলেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতায় তোফায়েল আহমেদের অবদান ও আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রবীণ এই রাজনৈতিক নেতার প্রথম জানাজা ধানমন্ডি-র তাকওয়া মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে তার মরদেহ জন্মভিটা ভোলা-য় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে জেলা স্কুল মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আওয়ামী লীগ-এর প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে যিনি ছিলেন সাহস ও প্রজ্ঞার রূপকার, তার এই চিরবিদায় বাংলাদেশ-এর রাজনীতির এক মহাকাব্যিক যুগের সমাপ্তি ঘটালো।
#রাজনীতি #বাংলাদেশ #তোফায়েল_আহমেদ #মুক্তিযুদ্ধ