প্রবীণ রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদের জীবনাবসান: এক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি
ষাটের দশকের উত্তাল গণআন্দোলন, ঊনসত্তরের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক, প্রবীণ ও বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন। সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টায় ঢাকা-র স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি এক কন্যা সন্তানসহ অসংখ্য রাজনৈতিক সহকর্মী, অনুরাগী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, নিউমোনিয়াজনিত মারাত্মক শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা নিয়ে গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে তিনি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসকদের দীর্ঘদিনের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি চিরবিদায় নেন। তার স্ত্রী আনোয়ারা আহমেদ গত বছরের ২০ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাদের একমাত্র সন্তান তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী পেশায় একজন চিকিৎসক।
ছাত্র রাজনীতি, গণঅভ্যুত্থান ও ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদান
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবন ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহে পূর্ণ। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ অধ্যয়নকালে ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে ইকবাল হলের (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ভিপি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৮-৬৯ সালের ঐতিহাসিক সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক আন্দোলন ও সর্বস্তরের ছাত্র আন্দোলন পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তার সাহসী নেতৃত্বের ভূমিকা তাকে তৎকালীন পুরো পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। প্রবল গণআন্দোলনের মুখে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী শেখ মুজিবুর রহমানসহ ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সব আসামিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
ঐতিহাসিক বিজয়ের পর ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ঢাকা-র তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক বিশাল সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়। লাখো জনতা ও ছাত্রসমাজের ঐতিহাসিক সেই বিশাল মহাসম্মেলনে তোফায়েল আহমেদ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন, যা বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
সংসদীয় রাজনীতি, সরকারে ভূমিকা ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবন
জাতীয় রাজনীতিতেও তোফায়েল আহমেদ অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পুরো রাজনৈতিক জীবনে তিনি মোট ৯ বার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বিভিন্ন মেয়াদে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আওয়ামী লীগ-এর সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী পর্ষদ Advisory Council বা উপদেষ্টামণ্ডলীর অন্যতম শীর্ষ সদস্য ছিলেন।
তার পুরো রাজনৈতিক জীবনে তিনি রাজনৈতিক চক্রান্ত, দমন-পীড়ন এবং ১৯৭৫ পরবর্তী সময়সহ বহুবার দীর্ঘমেয়াদে কারাভোগ করেছেন। দেশের প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকে তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
#রাজনীতি #বাংলাদেশ #তোফায়েল_আহমেদ #সংবাদ