প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, গুম বা এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স বিশ্বের নিকৃষ্টতম অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর। তিনি এটিকে মানবাধিকারের চরমতম লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে গতকাল শনিবার দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী এই মন্তব্য করেন।
৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়। দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব গুম হওয়া ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও সহমর্মিতা জানান। তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এই বাণী পোস্ট করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে জোর দিয়ে বলেন, গুম একটি বৈশ্বিক সমস্যা এবং মানবাধিকারের চরমতম লঙ্ঘন। বিশেষ করে বিশ্বের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে এ ধরনের অমানবিক ঘটনা ঘটে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা অনেক সময় সরকারবিরোধী আন্দোলন বা ভিন্নমতের রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে এই পথ বেছে নেয়।
গুমের অভিযোগ ও গোপন বন্দিশালা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অভিযোগ করেন যে, বাংলাদেশের পতিত, পরাজিত, পলাতক ফ্যাসিস্ট সরকার দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক–রাজনৈতিক অধিকার দমনে গুম-অপহরণের অমানবিক পথ বেছে নিয়েছিল। তিনি বলেন, গুম-অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর ধরে আটক রাখার জন্য গোপন বন্দিশালা তৈরি করা হয়েছিল। পলাতক ফ্যাসিস্ট আমলের এসব গোপন বন্দিখানা জনপরিসরে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট সরকার আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে কমপক্ষে সাত শতাধিক মানুষকে গুম করেছে। তিনি এই ঘটনাকে মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদারক বলে অভিহিত করেন।
বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ ও আইনি কাঠামো
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, বর্তমান সরকার প্রতিটি গুমের ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে গুম বা এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স বন্ধ করতে পৃথক আইনি কাঠামো প্রণয়ন করছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ উত্থাপিত হয়েছে। সরকার আশা করে, উত্থাপিত বিলগুলো যথানিয়মে আইনে পরিণত হলে ভবিষ্যতে আর কেউ গুম কিংবা অপহরণের মতো মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধের পথ বেছে নেবে না।
গুমের মানবিক প্রভাব ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে গুমের মানবিক দিক তুলে ধরে বলেন, গুম কিংবা অপহরণ শুধু একটি সংখ্যা নয় কিংবা একজন ব্যক্তির হারিয়ে যাওয়া নয়; বরং একটি পরিবারের স্বপ্ন, সাধ ও আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু। এটি একটি পরিবারের সামনে থমকে যাওয়া ভবিষ্যৎ। গুম হয়ে যাওয়া মানুষের অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের দিন কাটে এক অনিশ্চিত বাস্তবতায়, যেখানে কোনো সমাপ্তি নেই, নেই শোক পালনের স্বাভাবিক সুযোগ।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পথ ধরে ২০২৪ সালে বীর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট চক্রের পতনের পর সৌভাগ্যবান কেউ কেউ ফিরে এসেছেন। তবে ইলিয়াস আলী কিংবা চৌধুরী আলমের মতো অসংখ্য মানুষের আজও খোঁজ মেলেনি। প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন যে, আইসিসির রোম সনদের ৭(২) অনুচ্ছেদে গুমকে মানবতার বিরুদ্ধে একটি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং গুমের ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
রাষ্ট্র বা সরকার কর্তৃক গুম বা এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্সের বিরুদ্ধে বিশ্ববিবেককে জাগিয়ে রাখতে সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘ভিকটিমস ফার্স্ট, অ্যাকশনস নাউ’। প্রধানমন্ত্রী এই মনুষ্যত্বহীন অপরাধে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিচারসহ জবাবদিহির জন্য দুনিয়াজুড়ে ঐক্য–সংহতির আহ্বান জানান।