বাংলাদেশে প্রতি বাজেটেই উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও, তা প্রায়শই পূরণ হয় না। কর ফাঁকি, দুর্বল প্রশাসন, দুর্নীতি, বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহারকে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এত সংস্কার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এই সমস্যাগুলো টিকে আছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সমস্যার মূল কারণগুলো সম্পর্কে অবগত থাকলেও, সংস্কার প্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, করছাড়ের পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬.৪১ শতাংশ, যা মোট কর আদায়ের (৬.৮ শতাংশ) প্রায় সমান। এই চিত্র কর কাঠামোর একটি বড় দুর্বলতা নির্দেশ করে। এনবিআর কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পরিবর্তে তথ্য, নিয়ম ও ঝুঁকি যাচাইয়ের ভিত্তিতে কর প্রশাসন পরিচালনা করতে চায়। বর্তমানে আয়কর, ভ্যাট এবং কাস্টমস বিভাগগুলো বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে, এবং করনীতি প্রণয়ন ও আদায় একই প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীভূত। তথ্য ছড়িয়ে থাকলেও সিদ্ধান্তের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত।
সংস্কারের ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক শিক্ষা
১৯৯১ সালে ভ্যাট চালুসহ বড় অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু হয়েছিল, যার ফলে আশির দশকের জিডিপির ৬.৫ শতাংশ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রাজস্ব ৯.৬ শতাংশে উন্নীত হয়। তবে, এই গতি ধরে রাখা যায়নি। অটোমেশন, বড় করদাতা ইউনিট এবং অডিট সংস্কারের মতো উদ্যোগ নেওয়া হলেও করছাড়, দর-কষাকষি এবং কর্মকর্তার নিজস্ব সিদ্ধান্তের সুযোগগুলো রয়ে গেছে। অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, বেশি রাজস্ব কেবল করহার বাড়িয়ে আসেনি। করের আওতা বাড়ানো, বিশেষ সুবিধা কমানো, তথ্য একীভূত করা এবং ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের সুযোগ কমানোও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি কেবল কত কর তোলা হবে তা নয়, বরং কীভাবে তোলা হবে। এনবিআরের প্রস্তাবিত ‘একীভূত এনবিআর কাঠামো’ আয়কর, ভ্যাট এবং কাস্টমসকে একই প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এনে তথ্য ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এক করতে চায়। এটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও যথেষ্ট নয়। করহার, করের ভিত্তি এবং ছাড় নির্ধারণের নীতিগত কাজকে কর আদায় থেকে আলাদা করতে হবে। একইভাবে, কর নির্ধারণ, অডিট, প্রয়োগ, আপিল এবং করদাতা সেবার মধ্যেও স্পষ্ট সীমারেখা থাকা প্রয়োজন। করদাতার আস্থা কেবল কর কীভাবে নেওয়া হয় তার ওপর নির্ভর করে না, বরং করের টাকা কীভাবে খরচ হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই কর আদায়ের সক্ষমতা এবং সরকারি ব্যয়ের জবাবদিহি একসঙ্গেই বাড়াতে হবে।
রাজস্ব সংস্কারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিরোধ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একটি অন্তর্বর্তী সরকার করনীতি ও কর আদায় আলাদা করতে অধ্যাদেশ জারি করলে এনবিআরের ভেতর থেকে তীব্র প্রতিরোধ আসে। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, যাঁদের ক্ষমতা কমবে, তাঁরা কার্যত ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের কারণে আমদানি শুল্কের ওপর নির্ভরতা কমলে দেশের ভেতরের কর থেকে সেই ঘাটতি পূরণ করতে হবে। এর অর্থ বর্তমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ানো নয়, বরং করের আওতা বাড়ানো এবং দর-কষাকষি, ফাঁকফোকর ও ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তে যে রাজস্ব হারায়, তা কমানো। শুরুটা হওয়া উচিত করছাড় বাতিল না করে সেগুলোকে নিয়মের মধ্যে আনা। প্রতিটি ছাড়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, নির্দিষ্ট মেয়াদ এবং প্রকাশ্য যুক্তি থাকা উচিত। নতুন করে অনুমোদন না পেলে তা শেষ হবে। এতে সুবিধা তুলে নেওয়ার দায় সরকারের নয়, বরং সুবিধা রাখার যৌক্তিকতা প্রমাণের দায় হবে সুবিধাভোগীর। পরিবর্তনের চাপ শেষ পর্যন্ত অর্থের প্রয়োজন থেকেই আসতে পারে।